বিতর্কিত ডিআইজি মিজান গ্রেফতার

নিউজফিড,ঢাকা:
অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদকের মামলায় সাময়িক বরখাস্ত বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। হাইকোর্টের নির্দেশে সোমবার বিকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

আজ তাকে ঢাকা মহানগর দায়রা ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে হাজির করা হবে। ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমরা আদালতের নির্দেশ পালন করছি।’

এর আগে ডিআইজি মিজানুর রহমানের আগাম জামিন আবেদন খারিজ করে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গ্রেফতারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ঢাকা মহানগর দায়রা ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে হাজির করতে বলা হয়।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সোমবার বিকালে ডিআইজি মিজানুর রহমানের উপস্থিতিতে শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

শুনানির একপর্যায়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘সে (ডিআইজি মিজান) পুলিশের ভাবমূর্তি পুরোপুরি নষ্ট করেছে। আমরা টিভিতে দেখেছি, (দুদকের একজন পরিচালককে) ঘুষ দেয়ার ব্যাপারে সে ডেসপারেট বক্তব্য দিয়েছে।’

একই মামলার আরেক আসামি ডিআইজি মিজানের ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসানকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বিকাল ৪টায় আদালতের কার্যক্রম শেষ হলে ডিআইজি মিজানের পাশে পুলিশের এক কনস্টেবল এসে বসেন। এ সময় বিপুলসংখ্যক মিডিয়া কর্মী ও উৎসুক জনতা আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।

পরে বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে জিপ গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১১১৭২২) পুলিশের একটি টিম হাইকোর্ট থেকে গ্রেফতারকৃত ডিআইজি মিজানকে শাহবাগ থানার হেফাজতে নিয়ে যায়। সেখানে থানার ওসি আবুল হাসানের কক্ষে তাকে রাখা হয়।

রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি ওসির কক্ষেই ছিলেন। তবে সাংবাদিকদের সেই কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এমনকি ডিআইজি মিজান বা ওসি কোনো কথাও বলেননি। এ বিষয়ে রমনা জোনের এডিসি আজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তাকে (ডিআইজি মিজান) থানায় নিয়ে আসি।

দুদকের করা অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) তাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হবে।

শুনানির সময় আদালত খুব শক্তভাবে বলেছেন, এ ধরনের অফিসার একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি শেষ করে দিয়েছেন। শুধু দুদক নয়, তিনি ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে আরও একটি প্রতিষ্ঠানের (দুদক) ভাবমূর্তিও নষ্ট করেছেন।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, আদালতের এ আদেশ সমাজের জন্য একটা বার্তা। সেটা হল, অপরাধ করলে কেউ ছাড় পাবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আদালতের অবস্থান জিরো টলারেন্স।

এর আগে মামলায় আগাম জামিন চাইতে হাইকোর্টে হাজির হন ডিআইজি মিজান। আবেদনটি শুনানির জন্য উঠলে তার আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন মেহদী বলেন, আমাদের সিনিয়র আইনজীবী এম আমিন উদ্দিন ডিআইজি মিজানের পক্ষে শুনানি করবেন তাই সময় চাচ্ছি।

পরে বিকাল পৌনে ৪টার দিকে মমতাজ উদ্দিন মেহদী নিজেই শুনানি করেন। এ সময় ডিআইজি মিজান আদালতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুনানিতে আইনজীবী আদালতে বলেন, মিজান খুবই সৎ একজন পুলিশ অফিসার এবং তিনি সুনামের সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমন করেছেন।

পুলিশ বাহিনীতে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। তিনি শান্তিরক্ষা মিশনেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনজীবী বলেন, মামলায় সম্পদের তথ্য গোপনের যে অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে সেটা আমি অসঙ্গতি বলে মনে করি না। এটা বিরাট কিছু না।

এ সময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘সে (মিজান) পুলিশের ভাবমূর্তি পুরোপুরি নষ্ট করেছে।’ তার জামিন আবেদন নাকচ করে হাইকোর্ট আদালতে উপস্থিত মিজানকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ঢাকা মহানগর দায়রা ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে হাজির করতে বলা হয়। এ সময় উপস্থিত সব আইনজীবী ইয়েস ইয়েস বলে আদালতের আদেশের প্রতি সমর্থন জানান।

শুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ডিআইজি মিজানকে অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিং মামলায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ আছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা চাইলে তিনি কিভাবে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়লেন, টাকা পাচারে জড়িত কিনা, কেন তিনি দুদক কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিলেন- এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনতে পারেন।

এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠায় গত বছর জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় ডিআইজি মিজানুর রহমানকে। পরে তার বিরুদ্ধে পুলিশের সদর দফদতর ও দুদক থেকে পৃথকভাবে অনুসন্ধান শুরু হয়।

গত বছরের মে মাসে দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরুর পর ডিআইজি মিজান ও তার স্ত্রী রত্না রহমান সম্পদের হিসাব দাখিল করেন। তা যাছাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানে মাঠে নামে দুদক টিম। উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারি তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলে তাকে দুদক থেকে সরানোর ব্যবস্থা করেন।

পরে পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি ২৩ মে ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন।

কিন্তু তার বিরুদ্ধে ‘হালকা অনুসন্ধান’ ও মামলা না করার মতো অনুসন্ধান করতে পরিচালক বাছিরের সঙ্গে জানুয়ারি থেকে গোপন আলোচনা শুরু করেন ডিআইজি মিজান। বাছিরও তার ফাঁদে পা দেন। তিনি মিজানকে রক্ষার জন্য ৪০ লাখ টাকা নেন।

এর মধ্যে ১৫ জানুয়ারি রমনা পার্কে ২৫ লাখ টাকা ব্যাগে করে দেন ডিআইজি মিজান। এরপরও মামলার সুপারিশ করায় বাছিরকে ধরেন ডিআইজি মিজান। তিনি মামলার জন্য দুদক চেয়ারম্যান চাপ দিচ্ছিলেন বলে ডিআইজি মিজানকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

চতুর ডিআইজি এসব রেকর্ড করে রাখেন এবং ৯ জুন একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে এসব তথ্য দেন। তার বক্তব্য ও তথ্যের ভিত্তিতে ওই টেলিভিশন দু’জনের ৪০ লাখ টাকা ঘুষ কেলেঙ্কারির প্রতিবেদন প্রচার করে।

ওই দিনই বিষয়টি কমিশনের নজরে এলে দুদক সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ঘুষের ঘটনায় পৃথকভাবে তদন্ত করার সুপারিশ করে এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আসামির কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে পরিচালক বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে কমিশন।

একই সঙ্গে দু’জনের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্ল্যার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত দু’জনের অডিও ক্লিপের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য এনটিএমসিতে পাঠায়।

ওই পরীক্ষায় দু’জনের কথোপকথন ও ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত সব বিষয় পরীক্ষা করে প্রমাণ পায়। বিষয়টি দুদককেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘুষের ওই ঘটনা অনুসন্ধান শুরু হলে ডিআইজি মিজান নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টরির গোপন বৈঠক সংক্রান্ত আরেকটি গল্প সামনে নিয়ে আসেন।

তবে তাতে কাজ হয়নি। দুদকের টিম সেই গোপন বৈঠকের ঘটনাও অনুসন্ধান করছে। এরই মধ্যে ওই বৈঠকের বিষয়ে খোদ দুদকেরই দুই পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অনুসন্ধান টিম।

অপরদিকে, ২৪ জুন ডিআইজি মিজান, তার স্ত্রী রত্না রহমান, ভাই মাহবুবুর রহমান ও ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা অবৈধ সম্পদের মামলার তদন্ত শুরু হলে ডিআইজি মিজান সোমবার হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য চেষ্টা চালান।

দুদকের মামলায় ডিআইজি মিজানসহ চার আসামির বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা, ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here