বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বদলানো নেতার বিদায়

নিউজ ডেস্ক

১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটার পর পরবর্তীতে আর রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে না পারলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার গুরুত্ব ছিল। দেশের রাজনীতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন ট্রাম কার্ড। যারা এরশাদকে নিয়ে সমালোচ না করেছেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, তারই আবার নিজেদের জোটে বেরানোর জন্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে বৈঠকে বসেছেন।

জাতীয় পার্টির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

যদিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জোটগত রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন এরশাদ। ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের সময় অনেকটা নাটকীয় ঘটনার মধ্যদিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি ও তার দল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ওই নির্বাচন বয়কট করায় একমাত্র এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিই ছিল ক্ষমতাসীনদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম  মজুমদার বলেন, ‘যারা এরশাদের পতনের জন্য আন্দোলন করেছিল, তারাই আবার তাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দলের কাছে ভোটের রাজনীতি প্রাধান্য পায়। সেই সুযোগে জেনারেল এরশাদ এবং তার দল জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বৈধতা পেয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে এই দুই দল এরশাদকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছে। ফলে এরশাদের সামরিক শাসক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়ার পেছনে এই দুই দলের বড় অবদান রয়েছে।’

গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে এরশাদ গ্রেফতার হন। কারাগারে থেকেই ১৯৯১ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রংপুরের পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তৎকালীন সরকার এরশাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। একাধিক মামলায়  দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।

১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদ আবারও পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার কারণে সংসদে তার আসন বাতিল হয়ে যায়।

জোটগত রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ২০০০ সালে জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরে। দলটি তিন ভাগ হয়ে যায়। তবে জাপার মূল অংশটি সব সময় এরশাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পার্টির সভাপতি। ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে জয় লাভ করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির  নির্বাচনে জাতীয় পার্টি  আসন পায় ৩৪টি। এবার এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন এরশাদ। বর্তমান সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here