দীর্ঘদিন থেকে পদোন্নতি বঞ্চিত আরআরএফ

নিউজফিড,ঢাকা ::
পুলিশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গত দশ বছরে নিয়মিত পদন্নোতি থাকলেও বন্চিত হচ্ছেন আরআরএফে ( রেন্জ রিজার্ভ ফোর্স) কর্মরত পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী কর্মকর্তারা । প্রতিবছর দফায় দফায় পদোন্নতির পরীক্ষায় অংশ নিয়েও শেষ পর্যন্ত ফাইল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের টেবিল থেকে ফেরত এসেছে । এভাবে পদোন্নতি বন্চিত হয়েছেন রেন্জ রিজার্ভ ফোর্স’র (আরআরএফ) প্রায় সাত হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী ।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা , চট্টগ্রাম , রাজশাহী , বরিশাল , খুলনা , সিলেট বিভাগের ১২০ জন পুলিশ কনস্টেবল এএসআই হিসেবে পদোন্নতির পরীক্ষায় উর্ত্তীন্ন হন । কিন্তু বছর গড়ালেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় । একই বিষয়ে স্বরাস্ট্র মন্তণালয় পুলিশ হেড কোয়ার্টারে চার বার বিশদ ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয় । প্রতিবারই পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপযুক্ত ব্যাখা দিয়ে চিঠিও দেয়া হয় । ২০১৭ সালের অক্টোবরে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা অনুমোদন দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় । অনুমোদিত প্রস্তাবনা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আবারো চিঠি দেয় স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে । পুলিশ হেড কোয়ার্টার প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফাইলটি পুনরায় প্রেরন করে ২০১৮ সালের জুন মাসে । কিন্তু আবারো একই ধরনের তথ্য জানতে চেয়ে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে কাজ শেষ করেছে জনপ্রশাসন । মন্ত্রনালয়ে দড়ি টানাটানিতে এভাবেই ঝুলে রয়েছে শতাধিক পুলিশ কর্মচারীর ভাগ্য ।

জানা যায় , পুলিশ বাহিনীর সূচনা লগ্ন হতে দেশের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার নানা সময়ে পুলিশকে আরো গতিশীল ও পেশাগতভাবে দক্ষ করার জন্য নতুন নতুন ইউনিট গঠন করে। শুরু থেকে দেশের প্রত্যেকটি পুলিশ ইউনিটের পুলিশ সদস্যরা জনবল বৃদ্ধির পর শূন্যপদের বিপরীতে বাৎসরিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকেন । দেশের সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ, এসবি, সিআইডি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশ এবং সকল জেলা পুলিশের সদস্যরা নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী বর্ধিত জনবলের সৃষ্টপদে কাঙ্খিত পদোন্নতি লাভ করে থাকেন। কিন্তু পরীক্ষার মাধ্যমে অন্যান্য ইউনিটের প্রার্থীরা দ্রুত পদোন্নতি লাভ করলেও আরআরএফে এ নিয়ম অনুসরন করা হয়নি দীর্ঘদিন ।

দেখা যায় একজন পুলিশ কনস্টেবল তার চাকুরীকাল ০৬ বছর পূর্ন হলে পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। এতে করে একজন কনস্টেবল তার বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার পর মেধাতালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে শূন্যপদের মাধ্যমে পদোন্নতি লাভ করেন। যদি কখনো মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অধিকারী ব্যক্তি শূন্যপদের বিপরীতে পদোন্নতি না পান তাহলে তাকে পুনরায় নতুন করে পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধাতালিকার শীর্ষে থাকতে হয়। যুগ যুগ ধরে এভাবে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা তাদের পদোন্নতি লাভ করে থাকলেও ব্যাতিক্রম ঘটেছে আরআরএফে ।

২০১৬ সালের শুরুতে পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে আরআরএফ সংস্কার ও পদোন্নতি প্রস্তাবনা পাঠায় স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে । প্রস্তাবনায় আরআরএফ কে মাদক ও জঙ্গি মোকাবেলায় ব্যবহার করার পাশাপাশি পুলিশের এই প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায় করা কথা উল্লেখ করা হয় । প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয় অপ্রয়োজনীয় পদ বিলুপ্ত করে পদোন্নতি কার্যক্রম নিয়মিত করলে ১২ লক্ষ অতিরিক্ত খরচ পড়বে সরকারের । প্রস্তাবনায় আরআরএফে নতুন পদ সৃস্টি না করার পরামর্শও দেয়া হয় । কিন্ত জনপ্রশাসন থেকে প্রস্তাবনার ফাইলটি আর গতি লাভ করেনি । ভুক্তভোগীদের অভিযোগ লবিং না থাকার কারনে দীর্ঘদিন থেকে ফাইলটি জন প্রশাসনে বন্দি ।

বাংলাদেশ পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে তা দৃশ্যমান বটে কিন্তু তাদের এ সেবা প্রদানের মনোভাবকে আরো দৃঢ় করতে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকার প্রত্যেককে নির্ধারিত বিধি নিয়ম অনুসরন করে পদোন্নতি প্রদান করা উচিত বলে মনে করেন বিশিষ্ট জনেরা । তত্বাবধাায় সরকারের সাবেক উপদেষ্ঠা হোসাইন জিল্লুর মনে করেন , ‘ যে সকল ইউনিট এর অফিসার’গণ সরকারের বিবেচনায় হেভিওয়েট হয়ে থাকেন সে সকল ইউনিটসমূহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে বছরের পর বছর ক্রমানুপাতে সুযোগ সুবিধা ও পদোন্নতি পেয়ে থাকেন । আসলে আরআরএফে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তারা সে সুযোগ থেকে বন্চিত হয়ে আসছেন ২০০৯ সাল থেকে । ২০১০ সাল থেকে পুলিশ বাহিনীর মত একটি সু-শৃঙ্খল বাহিনীতে নানামুখি সংস্কার ও জনবল বৃদ্ধিতে হাত দেয় সরকার । কিন্তু আরআরএফকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে- সেটা আসলেই অমানবিক ‘

বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীকে পূর্বের চেয়ে গতিশীল ডিজিটালাইজড করার উদ্দ্যেগ নেয় । সরকারের নানামূখী পদক্ষেপে এ বাহিনী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে উন্নত সেবা প্রদান করছে। ধাপে ধাপে অধিক জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে আধুনিকায়ন করেছে। এ জনবল বৃদ্ধির ফলে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি জেলা-ইউনিটের প্রাপ্যতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা যোগ্যতা অনুযায়ী বিপুল হারে পদোন্নতি লাভ করলেও নিয়ম মানা হয়নি আরআরএফের ক্ষেত্রে ।

জানতে চাইলে আরআরএফে কর্মরত একজন পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান , মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ক্ষোভ ও হতাশা নিরসনের জন্য পুলিশের পদোন্নতি সুযোগ সুবিধা ও পদোন্নতিতে যে সকল ইউনিট অদ্যাবধি বঞ্চিত হয়েছে তাদের পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ও কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হবে। তার মতে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের উদাসীনতা ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সু-দৃষ্টির অভাবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে শূন্যপদ অথবা সৃষ্টপদের অভাবে দেশের ০৬টি বিভাগের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল) আরআরএফ (রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স) এর পুলিশ সদস্যরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধা সংক্রান্তে অন্যান্য ইউনিটের সাথে তুলনামূলক এ বৈষম্যের ফলে পুলিশ বাহিনীর এ সকল ইউনিটের মাঠ পর্যায়ে সদস্যদের মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধা সংক্রান্তে পুলিশ বাহিনীতে সারা দেশের সকল ইউনিটসমূহকে সমান ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

পুলিশ হেড কোয়ার্টারের একটি সুত্র জানায় , বর্তমান সরকারের আমলেই জনবল বৃদ্ধি ও সংস্কারের আওতায় একই পুলিশ ইউনিট বারংবার নবসৃষ্ট পদের বিপরীতে পদোন্নতির সুযোগ পেলেও দেশের অন্যান্য ইউনিটসহ আরআরএফ পুলিশ ইউনিট গুলো কখনো বিবেচিত না হওয়ায় ঐ সকল ইউনিটের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মাঝে পেশাগতভাবে চরম হতাশা বিরাজ করছে। সুত্রটির মতে অনেক পুলিশ সদস্য বর্তমানে শুধুমাত্র পুলিশ আইন ও পিআরবি বিধিমালা জনিত কারণে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামে কর্মরত আরআরএফের পুলিশ সুপার এম এ মাসুদ বলেন , বর্তমান সরকার শুধুমাত্র পুলিশ’ই নয় সকল সরকারী কর্মচারীর বেতন ভাতা ও পদোন্নতিসহ সকল সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে আন্তরিক। এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ও পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা জনিত কারনে পুলিশের প্রত্যন্ত এ সকল ইউনিট পদোন্নতিসহ সকল সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আরআরএফ সংস্কারসহ জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে খুব সহজেই এ সকল ইউনিটের নবসৃষ্ট পদ এর মাধ্যমে যোগ্য সদস্যদের পদোন্নতি দিয়ে এ সমস্যার অনায়াসে সমাধান করা যায় এবং এ ইউনিট গুলোকে গতিশীল ও দক্ষ করা সম্ভব। এর ফলে শুধুমাত্র পুলিশ বাহিনীই উপকৃত হবে না, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্থিক জনসাধারণও তাদের মাধ্যমে উন্নত সেবা পাবে। এছাড়া মাদক ও জঙ্গীবাদ নির্মুলে এ সকল ইউনিটের পুলিশ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

উল্লেখ্য যে, আরআরএফ সংস্কার সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে গত ০২ (দুই) বছর যাবৎ পরে থাকলেও মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এখনো পাশ হয় নি। যার ফলে অন্যান্য ইউনিটের সম সাময়িক যোগ্য প্রার্থীরা পদোন্নতিপ্রাপ্তরা পরবর্তী যোগ্যতা সাপেক্ষে পদোন্নতি পেলেও আরআরএফ এর সদস্য’রা অদ্যাবধি পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চিত ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here